মিশন শেষ হওয়ার প্রায় এক মাস পর অবশেষে শর্তপূরণ সাপেক্ষে ঋণের কিস্তিছাড়ের বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির পর্ষদে অনুমোদনের পর সামনের মাসে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড় করা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও আইএমএফের পক্ষ থেকে গতকাল পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার বিষয়টি জানানো হয়েছে।
আইএমএফের গবেষণা শাখার উন্নয়ন সামষ্টিক অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ক্রিস পাপাজর্জিওর নেতৃত্বে গত ৬ থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত সংস্থাটির চতুর্থ রিভিউ মিশন বাংলাদেশ সফর করে। মিশনটি দুই পক্ষের মধ্যে কোনো ধরনের সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। এর আগের চারটি মিশন শেষে কিস্তির অর্থছাড়ের বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আইএমএফ মিশনের কর্মকর্তাদের সমঝোতা হয়েছিল। তবে এবারই প্রথম অর্থছাড়ের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছতে ব্যর্থ হয় দুই পক্ষ। পরবর্তী সময়ে গত মাসে ওয়াশিংটন ডিসিতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভা চলাকালীনও বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় কোনো সমঝোতায় আসতে পারেনি আইএমএফ। এরপর সম্প্রতি বাংলাদেশের সঙ্গে বেশ কয়েক দফায় ভার্চুয়াল আলোচনায় অংশ নেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা। এতে শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি ও মুদ্রা বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার বিষয়ে দুই পক্ষের মতপার্থক্য কমে আসে এবং সমঝোতার পথ তৈরি হয়।
দীর্ঘ এ আলোচনার বিষয়টি উল্লেখ করে আইএমএফের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দুই পক্ষ ঋণ কর্মসূচির আওতায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে। কর রাজস্ব আহরণ ও বিনিময় হার সংস্কার বাস্তবায়ন সাপেক্ষে আইএমএফের পর্ষদে ঋণের কিস্তিছাড়ের বিষয়টি অনুমোদন পাবে।
সামষ্টিক অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চ্যালেঞ্জের কারণে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরো ৭৬ কোটি ২০ লাখ ডলার সহায়তার অনুরোধ জানানোর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে আইএমএফের বিজ্ঞপ্তিতে। এ বিষয়ে বলা হয়, এর ফলে ইসিএফ ও ইইএফের আওতায় ৪ দশমিক ১ বিলিয়ন ও আরএসএফের আওতায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়নসহ মোট সহায়তার পরিমাণ দাঁড়াবে ৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে। শর্তপূরণ সাপেক্ষে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি বাবদ বাংলাদেশ ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার পাবে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়ে আইএমএফ বলছে, গণ-অভ্যুত্থানের প্রভাবে চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে গেছে। তবে দ্বিতীয়ার্ধে এটি ৩ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। দুই অংকে পৌঁছে যাওয়া মূল্যস্ফীতি বর্তমানে কমতে শুরু করেছে এবং চলতি অর্থবছর শেষে এটি সাড়ে ৮ শতাংশে দাঁড়াবে বলেও প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতির নিম্নমুখিতা বজায় রাখতে স্বল্পমেয়াদে নীতি কঠোরতা বজায় রাখার পাশাপাশি রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছে আইএমএফ। পাশাপাশি বিদ্যুতে ভর্তুকি ব্যয়ের ক্ষেত্রে লাগাম টেনে ধরার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে দুর্বল ব্যাংকগুলোর সমস্যা সমাধানে সতর্ক পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি ব্যাংক খাতের পুনর্গঠন, সম্পদের মান পর্যালোচনা, ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি এবং ব্যাংক পরিচালনার পদ্ধতি উন্নত করার মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে আনা সহায়ক হবে বলে মনে করছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও সুশাসন সংহত করতে আইএমএফ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে।
এদিকে আইএমএফের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আইএমএফের চতুর্থ রিভিউ সফলভাবে শেষ হয়েছে। রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থাপনা ও মুদ্রা বিনিময় হার সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গভীর আলোচনা শেষে এ রিভিউ সম্পন্ন হয়েছে। এর ফলে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির অর্থ একসঙ্গে ছাড় করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর সঙ্গে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, এআইআইবি, জাপান, ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে আরো প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা জুনের মধ্যে বাংলাদেশ প্রত্যাশা করছে। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে এ অর্থপ্রাপ্তির ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরো শক্তিশালী হবে, যা মুদ্রার বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে।